সারাদিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে একটু শান্তিতে বসতে চান। কিন্তু সোফায় ছড়িয়ে থাকা কাপড়, টেবিলে জমে থাকা কাগজপত্র, মেঝেতে পড়ে থাকা খেলনা কিংবা রান্নাঘরের অপরিষ্কার বাসনপত্র দেখে যদি বিশ্রাম নেওয়ার আগেই বিরক্তি চলে আসে, তাহলে বিষয়টিকে নিছক ঘর পরিষ্কারের ঝামেলা ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আপনার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানসিক স্বস্তির সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
অগোছালো ঘর ও মানসিক চাপের সম্পর্ক
ঘর অগোছালো থাকলে কি সত্যিই মন খারাপ হয়? ২০২৫ সালের আগস্টে Journal of Environmental Psychology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫০১ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, ঘরের অগোছালো অবস্থা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতার মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। যাঁরা নিজেদের ঘরকে বেশি অগোছালো মনে করেছেন, তাঁদের মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি বেশি এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি ও মানসিক সুস্থতার মাত্রা তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
তবে গবেষণাটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে অগোছালো ঘরই মানসিক অশান্তির একমাত্র কারণ। আগে থেকেই মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তির পক্ষে ঘর গোছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, সম্পর্কটি দুই দিক থেকেই কাজ করতে পারে।
চোখের সামনে বিশৃঙ্খলা, মনের ওপর বাড়তি চাপ
ঘরে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছড়িয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। কোথায় চাবি রাখা হয়েছে, জরুরি কাগজপত্র কোথায়, কিংবা কাপড়ের স্তূপের মধ্যে পছন্দের পোশাকটি খুঁজে পাওয়া—এ ধরনের ছোটখাটো সমস্যাও প্রতিদিনের বিরক্তি বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, ঘরে ফিরেই যদি অসমাপ্ত কাজের তালিকা চোখে পড়ে, তাহলে অবসর সময়েও মনে হতে পারে অনেক কিছু এখনো করা বাকি। ফলে বাড়িতে থেকেও বিশ্রামের অনুভূতি পাওয়া কঠিন হতে পারে।
ঘরের পরিবেশ কি মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত?
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের গবেষক ডারবি স্যাক্সবে ও রেনা রেপেত্তির ২০১০ সালের একটি গবেষণায় ৩০ জন দ্বৈত-আয়ের দম্পতির বাড়ির পরিবেশ ও মানসিক অবস্থার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। যেসব নারী তাঁদের ঘরকে বেশি চাপপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে দিনের সঙ্গে নেতিবাচক মেজাজ বাড়ার সম্পর্ক দেখা যায়। তাঁদের কর্টিসলের দৈনিক ওঠানামার ধরনও তুলনামূলকভাবে কম খাড়া ছিল, যা কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণাটি ছোট পরিসরের হওয়ায় এর ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলা যায় না। তবে বাড়ির পরিবেশ যে মানুষের মানসিক অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তা বোঝার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
অগোছালো ঘর থেকে অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে
অনেকেই ঘর অগোছালো দেখে মনে মনে ভাবেন, ‘এতটুকু কাজও কেন করতে পারছি না?’ কর্মজীবী মানুষ, ছোট সন্তানের অভিভাবক কিংবা যাঁদের ওপর পরিবারের বেশির ভাগ দায়িত্ব থাকে, তাঁদের জন্য ঘর গোছানো আরও একটি অসমাপ্ত কাজের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
ফলে শুধু ঘরের বিশৃঙ্খলা নয়, নিজের প্রতি বিরক্তি ও অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে। অথচ ক্লান্তি, সময়ের অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা মানসিক চাপের মতো বাস্তব কারণেও ঘর অগোছালো থাকতে পারে। তাই ঘর গোছানো না থাকাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
ঘর শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি আমাদের বিশ্রাম, অভ্যাস ও দৈনন্দিন অনুভূতির সঙ্গেও জড়িত। গবেষণায় অগোছালো পরিবেশের সঙ্গে কম মানসিক সুস্থতা ও বেশি নেতিবাচক অনুভূতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে অগোছালো ঘর সরাসরি মানসিক সমস্যার কারণ- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো যথেষ্ট নয়।
