সারাদেশে চিংড়ি ঘের ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং এই খাতে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষেই এই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চিংড়ি মহালের সুষ্ঠু ও সুসমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং একটি কার্যকর নীতিমালা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের রাজস্ব আদায়ে কোনো প্রকার ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো লিজকৃত জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকা অবস্থায়ও আইনি নিষ্পত্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সরকার তার রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখতে পারবে।
তিনি চিংড়ি চাষের উপযোগী কিংবা যেখানে ইতোমধ্যে চিংড়ি চাষ হচ্ছে, এমন খাসজমি দ্রুত বন্দোবস্ত প্রদান এবং চিংড়ি মহাল কমিটিগুলো পুনরায় গঠন করার তাগিদ দেন। এছাড়া, ১৯৮০-র দশকে কক্সবাজারের চকোরিয়ায় সুন্দরবন নিধনের ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় বন (কোস্টাল ফরেস্ট) নির্ধারণ ও এর সীমানা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর বিশেষ জোর দেন।
সভাপতির বক্তব্যে ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেন, চিংড়ি খাতের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক দশকের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে, তেমনি চাষিরাও মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি উত্তরণে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো পুনর্গঠন এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি সংশোধন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য কেবল রাজস্ব বৃদ্ধি নয়, বরং এই খাতের ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বৈঠকে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানান, দেশের চিংড়ি মহালগুলো থেকে কীভাবে কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় করা যায় এবং অতীতে হওয়া নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করা যায়, সে বিষয়ে সভায় সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মূল ব্রত হলো—কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়া দেশের বঞ্চিত মানুষের কাছে স্বচ্ছভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়া। চিংড়ি ঘের ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং ভূমি মন্ত্রণালয়কে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতেই প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হচ্ছে।
সভায় কক্সবাজার জেলার চিংড়ি মহাল সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা নিরসন এবং তা বাস্তবায়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
এর মধ্যে রয়েছে—যেসব জমিতে বন নেই, সেগুলোকে বন বিভাগের গেজেট থেকে বাদ দিয়ে চিংড়ি চাষের জন্য অবমুক্ত করা; বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকা ১ লাখ ৯৫ হাজার একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে আনা।
এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লয়ার্স এসোসিয়েশন’ (বেলা) কর্তৃক হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিট মামলার কারণে ২০১২-১৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত স্থগিত থাকা কক্সবাজারের ১ হাজার ৪৬৬টি চিংড়ি মহালের কার্যক্রম সচল করতে মামলা নিষ্পত্তির দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ১৯৯২ সালের চিংড়ি মহাল কমিটি পুনর্গঠন, নতুন খাজনা নির্ধারণ এবং ইতোপূর্বের অপরিশোধিত সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ করার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়।
সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভূমি সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
