বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যান ও বর্জন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম। তার অভিযোগ, ‘সরকারের এই উদ্যোগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। সংবিধান সংশোধনের নামে রাষ্ট্র সংস্কারের বৃহত্তর দাবিকে সংকুচিত করা হচ্ছে।’
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এ অবস্থানের কথা জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিএনপি সরকারের গঠিত ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সাথে মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। তবে সভায় আমন্ত্রিত অতিথিদের বেশির ভাগই অংশ নেননি।
সভায় অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ পেলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিতব্য সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভায় ডাকসু ভিপি হিসেবে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি এবং ডাকসু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী এই প্রহসনের মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যান করছি এবং বর্জন করছি।’
সাদিক কায়েম বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহস্রাধিক শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। শুধু কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য এই গণঅভ্যুত্থান হয়নি। সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার এক বিষয় নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করতে পারে। তবে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে সংসদ বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।’
সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে ডাকসু ভিপি বলেন, ‘অতীতেও বিভিন্ন সংশোধনী আদালতের মাধ্যমে বাতিল হয়েছে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। পরে ২০০৫ সালে হাইকোর্ট এবং ২০১০ সালে আপিল বিভাগ সংশোধনীটি অবৈধ ঘোষণা করেন। একইভাবে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ছয়টি স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চের বিধান ১৯৮৯ সালে বাতিল হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও ২০১১ সালে আদালতের রায়ে বাতিল হয়।’
জুলাই জাতীয় সনদের বিভিন্ন প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়েও উদ্বেগ জানান সাদিক কায়েম। তার বক্তব্য, ‘সনদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি পরিবর্তন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব রয়েছে।’
এসব প্রস্তাবের কয়েকটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই শুধু ১৪২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংশোধন করে এগুলো বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সাদিক কায়েম বলেন, ‘জুলাইয়ের সংস্কার আকাঙ্ক্ষা এবং গণভোটে প্রকাশিত জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে আইনগতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি গাঠনিক সংস্কারপ্রক্রিয়া প্রয়োজন। কিন্তু সংস্কারকে শুধু সংসদীয় সংশোধনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষাকে সংকুচিত করছে।’
সরকারের উদ্যোগকে ‘জাতির সাথে প্রতারণা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো ভবিষ্যতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে রেখে এই প্রক্রিয়াকে টেকসই সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। সরকারের এই উদ্যোগ নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতিরও বরখেলাপ।
পোস্টের শেষাংশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান ডাকসু ভিপি। তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে গণভোটে ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। এই গণরায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের কোনো উদ্যোগে তিনি বা ডাকসু সম্পৃক্ত হবেন না।”
তিনি রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের পরিবর্তে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদের আলোকে অবিলম্বে একটি স্বাধীন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান।
