মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর তৎপরতার অভিযোগ। আন্দোলনে দলটির নেতা-কর্মীদের অনুপ্রবেশ, সংঘর্ষে উসকানি ও নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ তুলেছে পুলিশ ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির পরিবর্তে সরকার দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির পেছনে ষড়যন্ত্রকারীদের দায়ী করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশের প্রশ্নে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শ্রমিক অধিকার, আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক তৎপরতা ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বহুমুখী বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

আন্দোলনে আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশের অভিযোগ: পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে পুলিশ ও সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র। পুলিশের দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে পুঁজি করে একটি পক্ষ শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি এবং সংঘর্ষে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ তৎপরতার সমন্বয়ে ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লার নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের এনে আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন তিনি।

গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, মিরপুরে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তারা স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিক নন; বিভিন্ন জেলা থেকে এসে আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিলেন। অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে তাদের একটি অংশ সংগঠিত হয়েছিল বলেও দাবি করেছে ডিবি।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি দাবি করেন, গার্মেন্টসকর্মী পরিচয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। মিরপুরে ছাত্রলীগ নেতা সাজবুল ইসলাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, আন্দোলনকে উসকে দিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে এ ধরনের আরও আন্দোলন গড়ে তোলার অপচেষ্টা হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার পোস্টে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধেও আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সীমান্তের ওপার থেকে উসকানির অভিযোগ: শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে ইশারায় কেউ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পোশাকশিল্পে সম্ভাব্য অস্থিরতার বিষয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। গত ১৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শ্রম মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

এর আগে একই বৈঠকে তিনি বলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরিতে কিছু শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত। তাদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। কয়েকজনকে আইনের আওতায়ও আনা হয়েছে। তার ভাষ্য, শ্রমিক আন্দোলনের নামে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দমন-পীড়নের অভিযোগ নাহিদ ইসলামের: শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি জানান।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, গাজীপুর, মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কঠোর পরিশ্রমের পরও শ্রমিকরা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি পাচ্ছেন না। তাদের ন্যায্য দাবির জবাবে লাঠিপেটা, কাঁদুনে গ্যাস ও দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে। ফলে এই মজুরিতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, মূল্যস্ফীতির যুক্তিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন বাড়ানো হলেও শ্রমিকদের মজুরির দাবিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার চেষ্টা হচ্ছে। আন্দোলনকে রাজনৈতিক চক্রান্ত বা বিরোধী দলের উসকানি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতারও সমালোচনা করেন তিনি।

নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়ে নাহিদ বলেন, সেটিকে অজুহাত বানিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করা যায় না। তার দাবি, পুলিশ ও বিজিবির লাঠিপেটায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে সংবাদকর্মী ও সাধারণ পথচারীও রয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের কারণে সাধারণ শ্রমিককে আটক করার অভিযোগও তোলেন তিনি। ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ডের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তার মতে, অতীতে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে সময়ক্ষেপণের অভিজ্ঞতা থাকায় নতুন বোর্ডের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র দেখছে জামায়াত: এদিকে পোশাকশিল্পে অস্থিরতার পেছনে ষড়যন্ত্রকারীদের দায়ী করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এ খাতকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে ষড়যন্ত্রকারী ও ধান্দাবাজরা। তার ভাষ্য, বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা উদ্বেগজনক। কোনো মালিক কিংবা শ্রমিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। কোনো শ্রমিকই এ ধরনের কাজে জড়িত হবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।

শীত মৌসুম সামনে রেখে পোশাকশিল্পে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা ধ্বংসের পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। পরিস্থিতি উসকে দিয়ে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত করার অপচেষ্টা রুখতে সরকারকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন .

আপলোডকারীর তথ্য
Leave A Reply

Exit mobile version