রাত ৩:০৫,  ২৯ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিলে ওমানকে ‘উড়িয়ে দেওয়া’ হবে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন আকস্মিক ও চরম মন্তব্য ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চরম বিস্মিত করেছে। কারণ, ওমান কোনো সাধারণ রাষ্ট্র নয়, বরং আরব বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং আমেরিকার অন্যতম বিশ্বস্ত ও দীর্ঘস্থায়ী মিত্র দেশ।

১৮৩৩ সালে প্রথম উপসাগরীয় আরব দেশ হিসেবে ওমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। গত ১৫ বছর ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চরম উত্তেজনার সময়ে বন্দিবিনিময় থেকে শুরু করে পর্দার আড়ালের গোপন আলোচনা—সবক্ষেত্রেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে মাসকাট। এমনকি ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব এবং শীতল যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মাঝে, ১৯৮০ সালে ওমানই প্রথম উপসাগরীয় দেশ হিসেবে মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত ওমান তার নিজস্ব ইতিহাস এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে সব সময় একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে চলেছে। আরব সাগরের কৌশলগত অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ১৯ শতকে ওমান অন্যতম শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তবে এই কৌশলগত অবস্থানের কারণেই দেশটিকে বারবার পারস্য এবং সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তির আক্রমণ ও হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে ওমানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও তা সব সময় অত্যন্ত সতর্ক ও পরিমাপিত ছিল। প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোর মতো ইরান ওমানের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় হাব না হলেও, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেল সব সময় সচল রেখেছিল মাসকাট, যা দেশটিকে দুই চিরশত্রু দেশের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে চলতি বছর ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ওমানের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলার ঠিক একদিন আগে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যেদ বদর আলবুসাইদি মার্কিন টেলিভিশনে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে এবং একটি চুক্তি এখন হাতের নাগালে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ওমান এই সংঘাতের অন্যতম তীব্র সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং আলবুসাইদি হুঁশিয়ারি দেন যে, ওয়াশিংটন নিজের পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।

চলমান এই যুদ্ধের মাঝে ওমানের অভ্যন্তরেও বেশ কয়েকটি হামলা আঘাত হেনেছে। তা সত্ত্বেও ওমান ইরান ও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ঠিক এই কারণেই ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের এই শান্তিপ্রিয় ও কৌশলগত সহযোগীকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক হুমকি দেওয়াটা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নজিরবিহীন ও অদ্ভুত ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version