দুপুর ১:০০,  ১৮ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাওড়াঞ্চল ঘিরে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

তিনি বলেন, হাওড়ের মানুষ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও যুগের পর যুগ অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। কিন্তু যারা হাওড়াঞ্চল নিয়ে কাজ করছেন তারা কতটুকু করবেন তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কেননা হাওড়াঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক সময় স্থানীয় এমপিদের সঙ্গেও আলোচনা করার প্রয়োজন অনুভব করেননি সংশ্লিষ্টরা।

রোববার (১৭ মে) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘হাওড়ের দুর্যোগ: ‘চাষাভুষার সন্তান’ গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নেত্রকোণা সাংবাদিক ফোরাম-ঢাকা।

নেত্রকোণা সাংবাদিক ফোরাম-ঢাকার সভাপতি রফিক মুহাম্মদের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল হক, আলোচক হিসেবে অংশ নেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, ফারুক আহমেদ তালুকদার, মাসুদ করিম, রাজন ভট্টাচার্য ও বাহরাম খানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তারা। সেমিনারে কী-নোট উপস্থাপন করেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ মোফাজ্জল।

এ সময় তিনি হাওড়াঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবীকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী, টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নাই বিবেচনায় নিয়ে একটি স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠন করার আহ্বান জানান।

কায়সার কামাল বলেন, আমার জন্ম ও বেড়ে উঠা হাওড়ের মাঝখানে। ছোট বেলা থেকেই আমি হাওড়ের মানুষের কষ্ট, সংগ্রাম ও বঞ্চনার চিত্র কাছ থেকে দেখে আসছি। আমাদের কৃষক ও চাষীরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাওড়াঞ্চলের জন্য কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যখন ক্ষতি হয় তখনেই শুধু হাওড় নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ যা থাকে অনুপস্থিত।

নিজেকে চাষাভুষার সন্তান দাবি করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, চাষাভুষার সন্তান গ্রন্থে হাওড়াঞ্চলের বাস্তবতা, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং দুর্যোগের বহুমাত্রিক প্রভাব অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে উঠে এসেছে। এই ধরণের গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নীতিনির্ধারণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

হাওড়াঞ্চলে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে কায়সার কামাল বলেন, লিজ ব্যবস্থার মাধ্যমে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি হাওড়ের সম্পদ দখল করছে। প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিলের মধ্যে বড় গর্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হাওড়ের কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। আবার লিজ ব্যবস্থার কারণে মাছ ধরার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। এসব বৈষম্যের তিনি নিজেও সাক্ষী।

তিনি বলেন, এখন আবার নতুন আরেকটা কথা চালু হয়েছে। যেমন আমার কিছু কিছু এলাকায় আছে ৪৩ কেজি তে মণ। এটা অনেকে হয়ত বুঝেন না। কৃষকের ধান ৪৩ কেজি নিচ্ছে। মজুদ দ্বারা কিন্তু ওটাকে ৪০ কেজিতে এক মণ হয়, ৪০ কেজির দাম দিচ্ছে। এই যে কৃষকদের উপরে একটা সিস্টেমেটিক্যালি অত্যাচার করা হচ্ছে, নিপীড়ন করা হচ্ছে সেই জিনিসগুলা জাতীয়ভাবে এড্রেস হচ্ছে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করছেন, আমরা সকলকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে যদি কাজ করি তাহলে আমাদের নিজেদের জন্য যতটুক না পারি আমাদের সন্তানদের জন্য আগামীতে একটা মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

সংসদ সদস্য ড. আনোয়ারুল হক বলেন, হাওড় জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওড়ের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ে। তাই হাওড় রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

হাওড়ে যত উন্নয়ন হয়েছে বাস্তবিক অর্থে উন্নয়নের নামে ক্ষতি সাধন হয়েছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা গেছে হাওড়াঞ্চলের রাস্তা মেরামতে। বিগত সময়ে হাওড়ের উন্নয়ন সাধনে লুটপাট হয়েছে; হাওড়বাসীর কোনো উন্নয়ন হয়নি।

হাওড়াঞ্চলের দুর্যোগ ও করণীয় প্রসঙ্গে লেখক ও অর্থনীতি অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলেছেন, ব্যক্তি স্বার্থে উন্নয়ন যদি সামষ্ঠিক ক্ষতি হয় সেই উন্নয়ন রাষ্ট্রের কোনো মঙ্গল আনে না। সাবেক রাষ্ট্রপতি হাওড়াঞ্চলে যে দৃশ্যমান উন্নয়ন করেছে তা জীব বৈচিত্র্যর জন্য বর্তমানে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গীতিকবি ও চিন্তক ফরায়জী বলেন, আমরা ৫৫ বছর দলীয় সরকার পেয়েছি কিন্তু জনগণের সরকার পাইনি। আমরা যাকে সম্মান করা যাকে মাথায় তুলে রাখা তাকে আমরা পায়ের নিচে মেরে দিচ্ছি

সেমিনারে বক্তারা বলেন, বক্তারা হাওড় বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবিও জানান। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version