দেশনেত্রী, গনতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়া
সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও কর্মময় জীবন
দলীয় নেত্রী থেকে বাংলাদেশের অভিভাবক!!!!
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপার্সন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার তাঁর দীর্ঘ পথচলা ছিল সংগ্রাম, সাহস, আত্মত্যাগ ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার এক অনন্য অধ্যায়।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। শৈশব ও কৈশোর কাটে দিনাজপুরে। ১৯৬০ সালে দিনাজপুর গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। একই বছর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হউন।।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপি যখন গভীর সংকটে, তখন বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। ১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ নয় বছর তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনের সময় একাধিকবার তাঁকে আটক ও অন্তরীণ করা হলেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে স্বৈরশাসনের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।।
তাঁর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের অন্যতম ঐতিহাসিক অধ্যায় ছিল রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন। ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর সরকারের সময়ে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, ছাত্রীদের উপবৃত্তি, দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ এবং ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। একই সময়ে যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং বৃক্ষরোপণ একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।।
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর সরকারের ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হলে ১০ অক্টোবর তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।।
২০০১–২০০৬ মেয়াদে তাঁর সরকারের সময়ে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, শিল্প ও টেলিযোগাযোগ খাতের সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০০২–২০০৬ সময়ে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে ছিল বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সরকারের সময়ে কোস্ট গার্ড প্রতিষ্ঠা এবং শেয়ারবাজার তদারকির জন্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপও নেওয়া হয়।
তবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল একই সঙ্গে তীব্র বিতর্ক, রাজনৈতিক সংঘাত, মামলা, কারাবাস ও প্রতিকূলতারও সাক্ষী। ২০০৭–০৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে তিনি কারাবন্দি হন। পরবর্তী বছরগুলোতে শারীরিক অসুস্থতা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ সময়ের বন্দিত্ব তাঁর জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। তবুও তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ও নেতৃত্ব ধরে রাখেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি মুক্তভাবে রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় প্রত্যক্ষ করেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং ঢাকার জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে শুধু একটি দলের ইতিহাস দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘দেশনেত্রী’ ও ‘আপসহীন নেত্রী’; আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি নিঃসন্দেহে এক প্রভাবশালী ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া—একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি আপসহীন সংগ্রাম।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে আমৃত্যু অবিচল থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র কৃতজ্ঞতা।
রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি অসংখ্য প্রতিকূলতা, নির্যাতন, কারাবরণ ও ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছেন; তবুও মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। তাঁর নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও ত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
আজ তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই নেত্রীকে, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া—আপনার সংগ্রাম ও অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবন ও রাজনৈতিক অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকুক।
আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
আব্দুল কাদের, সম্পাদক, ভয়েস অফ বিডি ২৪ ডট কম