রাত ১০:৩৪,  ২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রথম কবে, কোথায় দেখেছিলাম তাঁকে, তা ঠিক মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন আমি ওই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ি। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছাত্রলীগ করি। তিনি তখন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্রসভায় বক্তৃতা করতে গিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, সামনে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন। আমরা মনে করতাম, তিনি আসবেন, দেখবেন, কথা বলবেন এবং ছাত্রদের মন জয় করে ফেলবেন। কারণ, তিনি হচ্ছেন ’৬৯-এর ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক। তোফায়েল আহমেদ।

প্রায় পঞ্চান্ন বছর আগের কথা, যখন তিনি তোফায়েল আহমেদ হয়ে উঠেছেন। জহুরুল হক হলের ছাত্র; ওই হলের ভিপি, সেই সুবাদে ডাকসুর ভিপি এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক।

তখন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী পাকিস্তানি জেনারেল ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের শাসনকাল। ১০ বছর শাসন করেছিলেন তিনি। তাঁর জবরদস্তি ও বৈষম্যমূলক শাসনের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ছয় দফা ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তাল হয়ে উঠেছিল আন্দোলন। এই আন্দোলন দমন করার জন্য পাকিস্তানি হানাদাররা সব রকম হামলা চালিয়েছিল। আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে সেই আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ছাত্রসমাজ এবং তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ। বলা যায়, তোফায়েল আহমেদই বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন জীবিত রেখেছিলেন। তিনি শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানানোর ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছিলেন। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পরে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।

আমাদের ছাত্রজীবনের আইকন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সে কত বছর আগের কথা! ’৬০-এর দশকের শেষ; সেই থেকে এই প্রায় ৫৫-৬০ বছরে এখনও আমার স্মৃতি আমার নিজের মধ্যে তো বটেই; আমি মনে করি, আমার বয়সের মানুষ যারা আছেন, তাদের সবার মধ্যেই জ্বলতে থাকা বাতির মতো উজ্জ্বল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন তোফায়েল আহমেদ এসেছিলেন, তখন সাংগঠনিকভাবে আমি তার সঙ্গে ছিলাম না। আমি জাসদ করতাম। আওয়ামী লীগের সাড়ে তিন বছরের শাসনকে দুঃশাসন মনে করতাম। ১৯৭৩-এ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তাঁর ভূমিকা আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কিন্তু তার পরও আজ এতগুলো বছর পরে যখন গতকাল বিকেলে সমকাল অফিসে বসে কাজ করতে করতে হঠাৎ তাঁর মৃত্যুর খবর শুনি, তখন মনটা বিষাদে ভরে গেল।

তোফায়েল ভাইয়ের মৃত্যু কোনো আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। দীর্ঘদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন। এই কয়েক মাস তো তাঁর খবরই ছিল না। শুনেছিলাম, তাঁর মস্তিষ্ক কাজ করত না। ছিলেন জীবন্মৃত। তথাপি তাঁর চলে যাওয়া মনের ভেতর একটা গভীর দাগ কেটে গেল।

পরে আমি আবার আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলাম। তখন সেই পুরোনো তোফায়েল আহমেদ নতুন করে আমার মনের মধ্যে আসন গেড়ে বসেছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আমি বেশ কিছুদিন বরিশাল বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছি। তোফায়েল ভাইয়ের বাড়ি ছিল ভোলায়। যখন বরিশালে প্রোগ্রামে যেতাম, তখন তাঁর বাড়িতেই থাকতাম।

আমি যখন গিয়েছি, তখন তাঁর বাড়িতে দালান ‍উঠেছে। কিন্তু যখন আমি যাইনি, আরও বেশ কয়েক বছর আগের কথা. যখন তিনি তোফায়েল আহমেদ হয়ে ওঠেননি, তখন সেখানে দালান ছিল না। একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। অন্যের বাড়িতে জায়গীর থেকে লেখাপড়া করেছেন। বর্তমানে কারান্তরালে আটক নেতা আমির হোসেন আমুর কথা বলতেন; আমু ভাই আমাকে বিএম কলেজে (ব্রজমোহন কলেজ) ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে কলেজ ছাত্র সংসদে ক্রীড়া সম্পাদক পদে দাঁড় করিয়েছিলেন। বলা যায়, তিনি আমাকে রাজনীতিতে দাঁড় করিয়েছিলেন।

বড় কষ্ট হয়, পাদপ্রদীপের আলোয় থাকা উদ্ভাসিত মানুষ তোফায়েল আহমেদের প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে এই মৃত্যুবরণ। এ রকম হলো কেন? এ পরিস্থিতি কি এড়ানো যেত? সেটা একটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। মানুষ তো জন্মগতভাবে সবাই সমান। নিজের শ্রমে আর মেধায় বড় হয়। উজ্জ্বল হয়। উজ্জ্বলতর হয়। কিন্তু যখন এগিয়ে যায়, তখন পেছন ফিরে দেখতে পারে না। যখন বড় হয়, তখন ছোট কিছু চোখে পড়ে না।

তোফায়েল ভাইয়ের কথা বলছি না, সবার কথা বলছি।

×
Share.
Leave A Reply

Exit mobile version