ড. লুই বেরের বিশ্ববিদ্যালয়টির চিকিৎসা বিভাগের অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি মন্ট্রিয়ল হার্ট ইনস্টিটিউটের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও শারীরিক কার্যক্রম কেন্দ্র ইপিক সেন্টারের গবেষক ও পরিচালক।
মন্ট্রিয়লে নিজের গবেষণাগারে বেরের ও তার দল শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যায়ামের বিভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করছেন। তাদের গবেষণার ফলাফলেও ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্ব উঠে এসেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন এই গবেষক।
তার মতে, মানুষের জীবনযাপনের ধরন এখনো স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
তিনি মনে করেন, স্কুলের দৈনন্দিন পাঠ্যক্রমে শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ওষুধের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করে বেরের বলেন, মানুষ দ্রুত ওজন কমাতে ওষুধের দিকে ঝুঁকছে। ওজেমপিকের জনপ্রিয়তা এর একটি উদাহরণ। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনের মূল কারণ দূর করার পরিবর্তে শুধু ওষুধের মাধ্যমে ওজন কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। জীবনযাপনের অভ্যাস পরিবর্তনে মানুষকে উৎসাহিত করার উদ্যোগও যথেষ্ট নয়।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে ধারণা করা হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনযোগ্য ১৪টি ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
বয়স বাড়লেও অভ্যাস পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে
অনেকে মনে করেন, ৬৫ বা ৭০ বছর বয়সে এসে জীবনযাপনের অভ্যাস পরিবর্তন করে আর লাভ নেই। তবে ড. বেরেরের মতে, অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য কখনোই খুব বেশি দেরি হয়ে যায় না।
তিনি বলেন, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে শিক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত জীবনের শুরুর দিকে শিক্ষা অর্জিত হয়। অন্যদিকে শ্রবণশক্তি হ্রাসের মতো সমস্যা পরবর্তী বয়সে দেখা দেয়। অনেকেই শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না কিংবা আড়াল করার চেষ্টা করেন। অথচ এটি গুরুতর জ্ঞানীয় সমস্যা ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিষণ্নতা বা আগ্রহের অভাবে কেউ শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারেন। এতে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ে। তার মতে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যও একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। হৃদ্যন্ত্রের জন্য যা ভালো, মস্তিষ্কের জন্যও তা ভালো।
ব্যায়াম ও মস্তিষ্কের উদ্দীপনায় মিলছে ইতিবাচক ফল
মন্ট্রিয়ল হার্ট ইনস্টিটিউটে অবস্থিত তাদের গবেষণাগারে শারীরিক ও জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের ওপর ব্যায়ামের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। এ কর্মসূচিতে ৫০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী ব্যক্তিরা অংশ নেন। তাদের গড় বয়স ৬৮ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ মৃদু জ্ঞানীয় সমস্যায় ভুগছিলেন, যা তাদের আশপাশের মানুষও লক্ষ করেছিলেন। আবার কারও মধ্যে উদ্বেগের সমস্যা ছিল। উদ্বেগ স্মৃতিশক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং ডিমেনশিয়ার পূর্বাভাস হিসেবেও কাজ করতে পারে। অন্যদিকে, কারও জ্ঞানীয় সমস্যা না থাকলেও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন কারণে তারা ঝুঁকিতে ছিলেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে মুঠোফোনে স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর বিভিন্ন খেলা ও অনুশীলন করানো হয়। এসব কার্যক্রম বিশেষ করে মনোযোগ, জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতা এবং মনোদৈহিক প্রতিক্রিয়ার গতি বাড়াতে সহায়তা করে। পাশাপাশি স্থির সাইকেল চালানো, ট্রেডমিলে হাঁটা বা দৌড়ানো এবং পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করানো হয়।
ড. বেরেরের মতে, শুধু শারীরিক কিংবা শুধু মানসিক অনুশীলনের চেয়ে দুই ধরনের ব্যায়ামের সমন্বিত চর্চাই সবচেয়ে কার্যকর।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। মৃদু জ্ঞানীয় সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ছয় মাসের প্রশিক্ষণের পর মনোযোগ, সতর্কতা ও সাড়া দেওয়ার গতিতে উন্নতি অনুভব করেছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়তে দেখা গেছে। স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, যদিও এ জন্য তুলনামূলক বেশি সময় প্রয়োজন হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন বায়োমার্কারের মাধ্যমে শারীরিক ও জ্ঞানীয় পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মস্তিষ্কের ইমেজিংয়ের সাহায্যে রক্তপ্রবাহ এবং স্মৃতিশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিপোক্যাম্পাসের মতো মস্তিষ্কের কাঠামোর পরিবর্তনও পরিমাপ করা হচ্ছে।
ড. বেরের জানান, অংশগ্রহণকারীরা সপ্তাহে তিন দিন শারীরিক ব্যায়াম করেন। এ প্রশিক্ষণ মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি বা নতুন সংযোগ তৈরি ও পরিবর্তনের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক প্রোটিন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। পেশি সক্রিয় হলে শরীর থেকে মায়োকাইন ও এক্সারকাইনের মতো বিভিন্ন অণু নিঃসৃত হয়। এগুলো বিপাকক্রিয়া, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং মানসিক অবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার ভাষায়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যায়াম অনেকটা অলৌকিক ওষুধের মতো।
নিয়মিত চর্চা না থাকলে এক মাসেই হারাতে পারে উপকার
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পর অনেকেই কিছুদিন ভালোভাবে নিয়ম মেনে চললেও একপর্যায়ে তা ধরে রাখতে পারেন না। এ বিষয়ে সতর্ক করে ড. বেরের বলেন, প্রশিক্ষণ বন্ধ করার এক মাস থেকে দেড় মাসের মধ্যেই ব্যায়ামের ইতিবাচক প্রভাব হারিয়ে যেতে পারে। বয়স যত বাড়ে, এ প্রভাব হারানোর গতিও তত দ্রুত হয়।
তাই দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নেওয়া যায়, এমন ব্যায়াম বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার মতে, দৌড়ানো একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যায়াম। এটি সহজে করা যায় এবং খরচও কম। দ্রুতগতিতে হাঁটাও উপকারী। তবে এমনভাবে হাঁটতে হবে, যাতে শরীরে কিছুটা ঘাম হয়।
এর পাশাপাশি পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম এবং শরীরের ভঙ্গি ও চলাফেরার সক্ষমতা উন্নত করার অনুশীলন করা প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বনির্ভরতা বজায় রাখতে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে পড়ে যাওয়ার ভয় একটি বড় উদ্বেগের কারণ। এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও শরীরের ভঙ্গি নিয়ন্ত্রণের ব্যায়াম, যেমন যোগব্যায়াম, তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন ড. বেরের।
