বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে মূল্যবান এই ধাতু।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্বর্ণের দাম কমে গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ধাতুটির দাম কমেছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা গত জুনের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে স্পট গোল্ডের দাম আগের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৩ ডলার ৩৪ সেন্টে নেমে আসে। দিনের শুরুতে দাম গত ২০ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছালেও পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
এদিকে, আগামী ডিসেম্বর মেয়াদের মার্কিন গোল্ড ফিউচার্সের দাম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২৮ ডলারে দাঁড়ায়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামের এই পতনের পেছনে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি থেকে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
স্বর্ণের বাজারে এখন গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ডলার। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ডটকমের বাজার গবেষণা প্রধান মন্টে সাফিয়েদিনের মতে, বিনিয়োগকারীরা আপাতত এই স্তর ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে গেলে বাজারের দৃষ্টিভঙ্গিতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে। তখন বিনিয়োগকারীরা সুদের হার কমার সম্ভাবনার পরিবর্তে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চড়া বন্ডের সুদ এবং শক্তিশালী মার্কিন ডলারের প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন।
স্বর্ণ থেকে নিয়মিত সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। ফলে সুদের হার বেশি থাকলে বন্ডসহ সুদভিত্তিক বিনিয়োগের তুলনায় স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগ ব্যয় বেড়ে যায়। এ কারণে উচ্চ সুদের পরিবেশে স্বর্ণের চাহিদা ও দামের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা স্বর্ণের বাজারেও প্রভাব ফেলছে। সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার পর অঞ্চলটি থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় শুক্রবার তেলের দাম বেড়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। এর প্রভাবে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে পারে—বাজারে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সাধারণত সুদের হার কমার সম্ভাবনা বাড়লে স্বর্ণের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে, সুদের হার দীর্ঘদিন বেশি থাকার আশঙ্কা স্বর্ণের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক দরপতনে এই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন আগামী ২৭ ও ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী বৈঠকের দিকে। পাশাপাশি আগামী সপ্তাহে প্রকাশিতব্য ব্যক্তিগত ভোগব্যয় মূল্যসূচক বা পিসিই-সংক্রান্ত তথ্যও বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পিসিই সূচক যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি বুঝতে ফেডের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপকগুলোর একটি। এই তথ্য মূল্যস্ফীতির চাপ সম্পর্কে নতুন ধারণা দেবে এবং ভবিষ্যতে সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশায় প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেনদেনকারীরা আসন্ন বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার প্রত্যাশা করছেন। তবে ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়তে পারে—এমন সম্ভাবনাও বাজারে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন লেনদেনকারীরা।
শুধু স্বর্ণ নয়, শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
স্পট সিলভারের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫৩ ডলার ৮৫ সেন্টে নেমেছে। প্ল্যাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে হয়েছে ১ হাজার ৫৫৯ ডলার ৭৬ সেন্ট। অন্যদিকে, প্যালাডিয়ামের দাম প্রতি আউন্স ১ হাজার ৫৩ ডলার ৪১ সেন্টে স্থিতিশীল ছিল।
সব মিলিয়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা মূল্যবান ধাতুর বাজারে চাপ তৈরি করেছে। আগামী সপ্তাহে ফেডের সিদ্ধান্ত ও মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য প্রকাশের পর স্বর্ণের দাম কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর বিনিয়োগকারীদের।
