রাজনীতির শক্তি গড়ে ওঠে আদর্শ, সততা ও সত্যের ওপর; তোষামোদ, চাটুকারিতা কিংবা তৈলমর্দনের ওপর নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় কিছু মানুষ ব্যক্তি-সন্তুষ্টিকে আদর্শের চেয়ে বড় করে তোলে। তারা নেতার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করে, ভুলকে সঠিক প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকে এবং সত্যকে আড়াল করে রাখে। এতে হয়তো সাময়িকভাবে কেউ খুশি হন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দল, নেতৃত্ব এবং পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংগঠনে নেতা অবশ্যই সম্মান পাবেন। কিন্তু সম্মান আর তোষামোদ এক বিষয় নয়। সঠিক সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ানো যেমন একজন কর্মীর দায়িত্ব,
তেমনি ভুল সিদ্ধান্ত হলে সম্মান বজায় রেখে গঠনমূলক সমালোচনা করাও একজন আদর্শবান কর্মীর কর্তব্য।
যেখানে তোষামোদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে ধীরে ধীরে সত্য বলা নিরুৎসাহিত হয়। যোগ্য ও সৎ মানুষ পিছিয়ে পড়েন, ব্যক্তিপূজা নীতিকে ছাপিয়ে যায়, আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, পুরো সংগঠনই এর মূল্য দেয়।
তৈলমর্দনকারী—নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতি
রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ সব সময় প্রতিপক্ষ নয়; অনেক সময় তারা নেতার আশপাশে থাকা সেই তৈলমর্দনকারীরা, যারা নেতাকে কখনো বাস্তবতার মুখোমুখি হতে দেন না।
তাদের কাছে নেতার কোনো ভুল নেই, কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, কোনো আত্মসমালোচনার প্রয়োজন নেই। তারা সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেয়, আর সত্য কথা বলা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে নেতা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, যোগ্য নেতৃত্ব উপেক্ষিত হয় এবং দল ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে।
একজন প্রকৃত কর্মী ব্যক্তি নয়, আদর্শের প্রতি অনুগত থাকেন। তিনি নেতাকে ছোট করতে নয়, নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করতেই সত্য কথা বলেন।
চাটুকারিতা—রাজনীতির নীরব বিষ
চাটুকারিতা কখনো কোনো সংগঠনের শক্তি নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সংগঠনের ভেতর থেকেই তাকে দুর্বল করে দেয়।
চাটুকারের লক্ষ্য থাকে নিজের পদ, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু একজন আদর্শবান কর্মীর লক্ষ্য থাকে দল, নীতি এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা।
যে সংগঠনে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকে, যুক্তিকে মূল্য দেওয়া হয় এবং আত্মসমালোচনাকে দুর্বলতা নয়, উন্নতির পথ হিসেবে দেখা হয়—সেই সংগঠনই দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর যেখানে চাটুকারিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেখানে একসময় সৎ, যোগ্য ও মেধাবী মানুষ নীরবে সরে যেতে বাধ্য হন।
কর্মীর ফোন ধরতে না পারা—বাস্তবতা নাকি নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা?
একজন নেতা সব সময় সব ফোন রিসিভ করতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু যদি একজন নেতা নিয়মিত কর্মীদের ফোন এড়িয়ে যান, যোগাযোগের পথ সংকুচিত করে দেন কিংবা কর্মীদের কথা শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে সেই নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
নেতৃত্ব শুধু মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়া বা পদ-পদবি ধারণ করার নাম নয়। নেতৃত্বের অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো কর্মীদের কথা শোনা, তাদের সম্মান দেওয়া এবং যোগাযোগের একটি কার্যকর ব্যবস্থা বজায় রাখা।
ফোন ধরতে না পারা কোনো সমস্যা নয়; কিন্তু পরে একটি কলব্যাক, একটি বার্তা কিংবা বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা একজন দায়িত্বশীল নেতার পরিচয়।
কারণ কর্মীরা যখন অনুভব করেন যে তাদের কথা শোনা হচ্ছে, তখন তারা আরও আন্তরিকভাবে সংগঠনের জন্য কাজ করেন। আর যখন তারা বারবার উপেক্ষিত হন, তখন তাদের মনোবল ধীরে ধীরে ভেঙে যায়।
মনে রাখা দরকার—
তোষামোদ নেতৃত্বকে দুর্বল করে, সত্যভিত্তিক পরামর্শ নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে। চাটুকার সাময়িকভাবে একজন নেতাকে খুশি করতে পারে, কিন্তু সত্যবাদী সহযোদ্ধাই একজন নেতাকে ইতিহাসে সম্মানিত করে।
একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে আদর্শ, সততা, জবাবদিহি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সত্য বলার সাহসের ওপর—অন্ধ আনুগত্য, ব্যক্তিপূজা বা তৈলমর্দনের ওপর নয়।
“নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি অন্ধ প্রশংসাকারী নয়; সত্য কথা বলার সাহসী সহযোদ্ধা।”
সম্পাদক , voiceofbd.editor@gmail.com
