রাত ৪:৪৭,  ৩ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঘর নাটকটি দিয়ে। এভাবেই পাঁচ বছর সময় পার করে দিলেন ঢাকা আর্ট কলেজে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও কামরুল হাসানের সঙ্গেছবি: শিল্পীর পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

৫.

১৯৬৫ সালে ঢাকায় যখন টেলিভিশনের শুরু হলো, তখন লোক খুঁজছিলেন কলিম শরাফী ও জামিল চৌধুরী। ডাক পড়ল মুস্তাফা মনোয়ারের। আর্ট কলেজের চাকরি ছেড়ে টেলিভিশনের ‘লোক’ হলেন মুস্তাফা মনোয়ার। ‘টেলিভিশনে যোগ দেওয়া মূল লক্ষ্য ছিল বাংলা সংস্কৃতিকে নানাভাবে তুলে ধরা। তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের রেষারেষি ছিল। যতটা পারা যায় বাংলা সংস্কৃতিকে প্রচারের চেষ্টা আমরা করে গেছি। শিল্পীর যেহেতু অভাব ছিল, তাই শিল্পী তৈরি করার জন্য ও খুঁজে বের করার জন্য নানা অনুষ্ঠান করেছিলাম সেই ’৬৭ সাল থেকেই এবং অনেক নতুন শিল্পী আমরা এর মধ্য দিয়ে খুঁজেও পেয়েছিলাম।’

পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে যে ‘রেষারেষি’ বহু আগেই শুরু হয়েছিল, একাত্তরের মার্চ নাগাদ তা চরমে ওঠে। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। সেদিন কিছু সরকারি ভবন ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা তেমন ওড়েনি। টিভিতে তখন অনুষ্ঠানের শেষে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো দেখানো হতো। অনুষ্ঠান শেষ হতো রাত ১০টায়। এরপর জাতীয় পতাকা দেখিয়ে সম্প্রচারের সমাপ্তি। এটাই ছিল নিয়ম। মুস্তাফা মনোয়ার ঠিক করলেন, আর যা-ই হোক, ২৩ মার্চ তিনি ঢাকার টিভিতে পাকিস্তানের পতাকা দেখাবেন না। ‘সেদিন আমি রাত ১০টার আগে সম্প্রচার ও জরুরি লোকজন ছাড়া বাড়তি লোকজনকে ছুটি দিয়ে দিলাম। তখন ডিআইটির টিভিকেন্দ্রটির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তানের এক মেজর। তাঁর অধীনে প্রায় ৫০ জন সৈন্য। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, অনুষ্ঠান ১০টার পরিবর্তে ১২টা পর্যন্ত চালাব। মেজর এসে আমাদের কাছে জানতে চাইলেন, আমরা অনুষ্ঠান শেষ করছি না কেন। বললাম, পাকিস্তান দিবস তো, তাই বাড়তি অনুষ্ঠান চালাচ্ছি। এ সময় আমরা বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান প্রচার করলাম। রাত ১২টার পর যখন ২৩ তারিখ পার হয়ে গেছে, তখন আমরা পাকিস্তানের পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করি। এর পরদিন থেকে আর টেলিভিশনে যাওয়া হয়নি।’

২৫ মার্চের পর আগরতলা হয়ে কলকাতা চলে যান মুস্তাফা মনোয়ার। শিল্পী হিসেবে যা করার কথা, তা-ই করেছেন তিনি। কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, সেখানে যোগ দিয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন বিভিন্ন স্থানে। তখন দিল্লিতেও দল নিয়ে গেছেন তিনি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন স্থানে ও টিভিতেও তখন অনুষ্ঠান করেছে দলটি।

সপরিবারেছবি: শিল্পীর পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

৬.

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই দেশে ফিরতে হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারকে। প্রবাসী সরকারের নেতারা দেশে আসবেন, তাঁদের টিভিতে কাভারেজ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর ওপর। সেনাবাহিনীর বিমানে করে ফিরেছেন ১৮ ডিসেম্বর। দেশে ফিরেই লেগে গেলেন টেলিভিশনকে নতুন করে গড়ার কাজে। ‘পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে বাধা ছিল টেলিভিশনে। নজরুলের অনেক গান গাইতে দেওয়া হতো না। লোকগান প্রচারের ক্ষেত্রেও ছিল বাধা। নতুন করে বাংলাদেশ টিভিকে সাজাতে গিয়ে এসব জিনিস বিবেচনায় নিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের কথা প্রচার করতে অনুষ্ঠান শুরু করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের নাটক করার স্বপ্ন ছিল, রক্তকরবী করতে চেয়েছিলাম, এসব করার সুযোগ এল।’

বলা যায়, এ ‘সুযোগ’ কাজে লাগিয়ে টিভি অনুষ্ঠানে এক নতুন শৈলী আনার চেষ্টায় নেমে পড়েন তিনি। বানালেন রক্তকরবী ও শেকসিপয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা মুখরা রমণী বশীকরণ-এর মতো নাটক। বাংলাদেশে টিভি নাটকের ইতিহাসে যেগুলো ধ্রুপদি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এই নাটক দুটি যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’র জন্য মনোনীত হয়েছিল। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে যে ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠান শুরু হয়, সেটারও রূপকার আর কেউ নন, মুস্তাফা মনোয়ার।

৭.

বাংলাদেশে এখন পাপেট শব্দটির সঙ্গে যে নামটি জুড়ে আছে, সেটি অবশ্যই মুস্তাফা মনোয়ারের। ছোটবেলা থেকেই কার্টুন বা এ ধরনের চরিত্রের প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল তাঁর। বিভিন্ন কার্টুনের চরিত্র কপি করারও চেষ্টা করতেন তখন। হুগলিতে গিয়ে পাপেটের সঙ্গে প্রথম ভালো করে পরিচয়। বাঁকুড়ায়ও দেখেছেন বাঁশের বড় পুতুল বা পাপেট। তিন-চার ফুটের এই পাপেটগুলোকে নিচ থেকে নাচানো হতো। এগুলো সবই তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে কলকাতা আর্ট কলেজে পড়ার সময় রাজস্থানি পাপেট দেখার অভিজ্ঞতা। ‘দুই সুতার এই পাপেট আমাকে দারুণ আকর্ষণ করে। অসাধারণ দক্ষতায় শিল্পীরা এগুলো দিয়ে পারফর্ম করাতেন। টিভিতে যোগ দেওয়ার আগে ঢাকা আর্ট কলেজে থাকতেই এসব নিয়ে কিছু কাজ করেছি। যোগ দেওয়ার পর বুঝলাম, টিভিতে এসব ব্যবহারের সুযোগ আছে। আমাদের দেশেও পাপেট বা পুতুলনাচের ব্যবহার ছিল, তিন সুতা ব্যবহার করে সেগুলোকে নাচানো হতো। কিন্তু এগুলোর মুখের এক্সপ্রেশন বা চোখ নাড়ানো যেত না। টিভির চাহিদা আলাদা। এখনো ক্লোজ শট, লং শট ব্যবহার করার সুযোগ আছে। তখন বিভিন্ন কারিগরি কৌশল যুক্ত করে টিভির জন্য উপযোগী পাপেট তৈরি করার কাজে নেমে পড়লাম।’

পদ্মা নদীর মাঝি সিনেমার সেটেছবি: শিল্পীর পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

টেলিভিশনের সেই পাকিস্তান পর্বেই পাপেট চর্চার শুরু হয়েছিল এভাবেই। সেই ’৬৬ সালে টিভিতে ‘আজব দেশে’ নামে অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামে দুটি পাপেট চরিত্র সৃষ্টি করেন, যে চরিত্র দুটির মধ্য দিয়ে তখন তিনি সে সময়কার রাজনৈতিক পরিবেশ ও এ দেশের সংস্কৃতি নিয়ে পাকিস্তানিদের বিরোধী অবস্থানকে ব্যঙ্গ করে গেছেন। ‘আমার এই অনুষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল দেশাত্মবোধ জাগানো।’ তুমুল জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটি চলেছিল টানা তিন বছর। স্বাধীনতার পর তিনি পাপেটের কেন্দ্রীয় একটি চরিত্র তৈরি করেছিলেন ‘পারুল’ নাম দিয়ে। ‘পারুল এক বুদ্ধিমতী মেয়ে। আমাদের রূপকথায় একটি গল্প আছে, বোন পারুল তার ঘুমন্ত সাত ভাইকে জাগিয়ে তুলেছিল। সেখান থেকেই আমি চরিত্রটির নামটি নিয়েছি। আমার উদ্দেশ্য ছিল, এই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিল্পকলা ও নান্দনিকতার বোধ জাগানো। আসলে সৌন্দর্যের বোধটি সব ক্ষেত্রেই দরকার।’ আজকে ‘মীনা’ নামে যে কার্টুন চরিত্রটি গড়ে উঠেছে, তা এই পারুল চরিত্রটির এক আলাদা রূপ।

৮.

কোনো অনুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে যাঁর উপস্থিতি জরুরি হয়ে পড়ে, তিনি মুস্তাফা মনোয়ার। অনেক প্রশংসিত দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ সাফ গেমসের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান পরিচালনা ও ভিজুয়ালাইজারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ‘সার্ক সন্ধ্যার’ মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানটি হয়েছে তাঁরই নির্দেশনায়। এর নৃত্য ও সংগীত পরিচালনা—দুটোই করেছেন তিনি। এই সেদিন, ২০১০ সালে একাদশ সাফ গেমসের বিশাল মাসকট ‘কুটুম’ নামের দোয়েল পাখিটিও তাঁর করা। এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ নির্মাণের পাশাপাশি গেমসের অনুষ্ঠানের প্রোডাকশন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

চিত্রকলা দিয়ে যাঁর শুরু, ‘ভালো’ জলরং আঁকিয়ে হিসেবে যিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন, তিনি আজ পাপেটের ‘লোক’। ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি কেবল চিত্রকলায় সীমাবদ্ধ নয়। পারফর্মিং আর্টের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক বোধকে জাগিয়ে তোলা যায়, সেই চেষ্টাই সারা জীবন করে গেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিত্রকলা আমাকে সাহায্য করেছে।’ (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

আরও পড়ুন

তিনজনের বাধায় বেঁচে গেল ‘৫০০ বছর’ বয়সী বটগাছ

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version